শেখ মুজিবের মাজারে তারেক রহমান - বাছির জামাল
প্রচার শীর্ষে থাকা একটি জাতীয় দৈনিক-এর ১০ নভেম্বর সংখ্যার প্রথম পাতায় প্রকাশিত মধ্যরাতে বঙ্গবন্ধুর মাজারে গিয়েছিলেন তারেক রহমান শিরোনামের খবরটি দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছে। খবরে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অঙ্গনে ওই সময়ের এমন প্রশংসনীয় একটি ঘটনা মিডিয়ায় আসেনি। কারণ তখন ওই ঘটনাটি ছিল টপ সিক্রেট। তারেক রহমান টুঙ্গিপাড়ায় শেখ মুজিবুর রহমানের মাজারে যাওয়ার আগে কোথায় যাচ্ছেন সে বিষয়ে সঙ্গে থাকা দলের অন্য নেতাদের কাউকেই কিছু জানাননি। এমনকি তার সঙ্গে কোনো মিডিয়া কর্মীও ছিলেন না। তারেক তার সফরসঙ্গীদের শুধু বললেন, আমরা এক জায়গায় যাব। পুরো সংবাদটি পাঠ করলে মনে হয় না যে কোনো অসৎ উদ্দেশে রিপোর্টটি তৈরি করা হয়েছে। তবে উপর্যুক্ত প্যারার কয়েকটি বাক্যে যেসব তথ্য তুলে ধরা হয়েছে, তার কোনোটিই সত্য নয়। ঘটনাটি ২০০৫-এর ২৭ ফেব্রুয়ারির। গোপালগঞ্জে বিএনপির ইউনিয়ন প্রতিনিধি সভায় যোগদান শেষে তারেক রহমান রাতে ঢাকা ফেরার পথে শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারত করেন, ফাতেহা পাঠ করে মোনাজাত করেন। তার সঙ্গে তখন বর্তমান লেখকসহ সকল জাতীয় দৈনিক ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা ছিলেন। তাই তারেক রহমানের শেখ মুজিবুর রহমানের মাজারে যাওয়ার ঘটনাটি তখনকার সময়ের প্রায় সব পৃন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় বেশ ফলাও করেই প্রচার হয়েছিল। এ কারণে ঘটনাটি ছিল টপ সিক্রেট এবং তারেক রহমানের সঙ্গে কোনো মিডিয়াকর্মী ছিলেন না তা বোধ করি ঠিক নয়। ২০০৫ থেকে বছরব্যাপী সারা দেশে বিএনপির ইউনিয়র প্রতিনিধি সভা কর্মসূচি শুরু হয়। এর আগে ঢাকায় বিভাগীয় প্রতিনিধি অনুষ্ঠিত হয়। ২০০২-এর জুন মাসে দলের সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব নির্বাচিত হয়েই তারেক রহমান বিএনপিকে তৃণমূল পর্যায়ে সংগঠিত করার লক্ষ্যে এসব কর্মসূচি শুরু করেন। তিনি বিএনপির দেশব্যাপী যে উনিশ কিংবা বিশটি ইউনিয়ন প্রতিনিধি সভা হয়েছিল, তার অংশ হিসেবে শেখ মুজিবুর রহমানের নিজ জেলা গোপালগঞ্জের সভায় গিয়েছিলেন। সভা শেষে তারেক রহমান যদি শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারত না করেই ঢাকায় ফিরে আসতেন তাহলে তা শোভন হতো না। তাই তিনি সভা শেষে ঢাকা ফেরার পথে মাজারে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং এটি মিডিয়ার সবাইকে জানিয়েও রাখেন। বিএনপি চেয়ারপারসনের তৎকালীন রাজনৈতিক কার্যালয় হাওয়া ভবনের মুখপাত্র ও মিডিয়া সমন্বয়কারী আশিক ইসলাম আমাদের জানালেন, তারেক রহমান সভা শেষে শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারত করবেন। তবে আশিক ঘটনাটি অন্য কাউকে না জানানোর অনুরোধ করলেন। আমরা তার কাছে জানতে চাইলাম, মাজার জিয়ারতের নিউজ করা যাবে কিনা। আশিক ইসলাম কোনো বাধা-নিষেধ নেই জানালে আমরা সবাই ঢাকায় যার যার অফিসে তারেক রহমানের শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারত করতে যাওয়ার বিষয়টি জানিয়ে রেখেছিলাম। অগ্রিম জানিয়ে রাখার কারণ এই যে, ইউনিয়ন প্রতিনিধি সভা শেষে মাজার জিয়ারত করতে রাত নয়টা পর্যন্ত বেজে যেতে পারে। এরপর আমাদের নিউজ পাঠাতে রাত দশটা বেজে যাবে। তাই নিউজ ধরাতে পত্রিকার প্রথম এডিশনের মেকআপ দেরি করে শুরু করার জন্যই অগ্রিম জানিয়ে রাখা। এ কারণে তারেক রহমানের শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারত করার সংবাদটি পরদিন সকল জাতীয় দৈনিকের প্রথম পাতায় ছবিসহ প্রকাশ হয়। ইলেকট্রনিক মিডিয়াগুলোতেও সেদিন রাতেই নিউজটি গুরুত্ব দিয়ে প্রচারিত হয়। তারেক রহমান ইউনিয়ন প্রতিনিধি সভা শেষে বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতাদের নিয়ে টুঙ্গিপাড়ায় অবস্থিত শেখ মুজিবুর রহমানের মাজারে গিয়েছিলেন। রাত আটটা চব্বিশ মিনিট থেকে আটটা পয়ত্রিশ মিনিট পর্যন্ত প্রায় এগারো মিনিট তিনি মাজারে অবস্থান করে ফাতেহা পাঠ করেন। জিয়ারত শেষে তিনি সাংবাদিকদের জানান, একজন শ্রদ্ধেয় নেতা (শেখ মুজিবুর রহমান) হিসেবে তাকে শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি। দেশের জন্য তার অনেক অবদান রয়েছে। দেশের কালচারে এ রকম নেই সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি কিছু বলব না। যতোদূর মনে পড়ে, মাজার জিয়ারতের সময় সাংবাদিকদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন বাসস-এর সিনিয়র রিপোর্টার বর্তমানে লন্ডনে অবস্থানরত মাহমুদুল ইসলাম লিটন, ইউএনবির সিনিয়র রিপোর্টার বর্তমানে লন্ডনে অবস্থানরত সালেহ শিবলী, প্রথম আলোর তখনকার বিশেষ প্রতিনিধি আরিফুর রহমান দোলন (বর্তমানে নিউজ পোর্টাল ঢাকা টাইমস-এর সম্পাদক), দৈনিক দিনকালের তখনকার সিনিয়র রিপোর্টার কাদের গণি চৌধুরী (বর্তমানে আমার দেশে কর্মরত), দৈনিক ইত্তেফাকের সিনিয়র রিপোর্টার আনোয়ার আলদীন, দৈনিক জনজণ্ঠের তখনকার সিনিয়র রিপোর্টার মোশাররফ আহমেদ বাবলু (বর্তমানে কালের কণ্ঠে কর্মরত), আরটিভির সিনিয়র রিপোর্টার সীমান্ত খোকন (বর্তমানে এনটিভির বার্তা সম্পাদক), সমকালের সিনিয়র রিপোর্টার লোটন একরাম (বর্তমানে একই পত্রিকার চিফ রিপোর্টার) এবং আমার দেশ-এর তখনকার সিনিয়র রিপোর্টার বাছির জামালসহ অন্য জাতীয় পত্রিকা ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিক ও ক্যামেরাপার্সনরা। এত দিনের ব্যবধানে সকলের নাম মনে না থাকলেও মাজার জিয়ারতের সময় যে সাংবাদিকদের উপস্থিতি ছিল এবং ঘটনাটির ব্যাপক কাভারেজ হয়েছিল তা স্মরণে রয়েছে। দলীয় নেতাদের মধ্যে তারেক রহমানের সঙ্গে ছিলেন বিএনপির তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক আমানউল্লাহ আমান, রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, রশিদুজ্জামান মিল্লাত, সাইফুর রহমান নান্টু, সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স এবং গোপালগঞ্জ জেলা বিএনপির তৎকালীন সভাপতি এম এইচ খান মঞ্জুসহ অন্য নেতারা। ওই পত্রিকার প্রতিবেদনেই বলা হয়েছে যে, এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে গোপালগঞ্জ জেলা বিএনপির তৎকালীন সভাপতি এম এইচ খান মঞ্জু বলেন, গোপালগঞ্জের প্রতিনিধি সম্মেলন শেষে রাতে তারেক রহমান সদলবলে টুঙ্গিপাড়ায় শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারত করতে যান। এ বিষয়টি সফরসঙ্গী দলীয় নেতারা জানতে না পারলেও স্থানীয় নেতা হিসেবে তিনি ও আরো কয়েকজন আগে থেকেই জানতেন। তাই স্থানীয় নেতা-কর্মীরা আগে থেকেই মাজারে উপস্থিত হন। তারেক রহমান মাজারে পৌছার পর সেখানে স্থানীয় নারী-পুরুষ মিলে প্রায় তিন-চার শ লোক উপস্থিত হন। জনাব মঞ্জুর বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, তারেক রহমান যে শেখ মুজিবুর রহমানের মাজারে যাবেন তা সংশ্লিষ্ট সব নেতাই জানতেন। তবে নিরাপত্তার কারণে ঘটনাটি সবাইকে জানানো না হলেও হতে পারে। শুধু তারেক রহমান কেন এর আগে তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াও শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারত করেছিলেন। কিন্তু মা-পুত্রের এমন ঔদার্যকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের সকল নেতাই এমন কোনো অশ্লীল বাক্য নেই, যা শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানকে নিয়ে বলেননি। জীবিত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে সর্বোচ্চ খেতাব বীর-উত্তম পেলেও শহীদ জিয়া মুক্তিযোদ্ধা নন বলে অবলীলায় বক্তব্য রাখছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। তারা মু্িক্তযুদ্বের ঘোষক, সেক্টর কমান্ডার ও জেড ফোর্সের অধিনায়ক জিয়াউর রহমানকে পাকিস্তানের চর হিসেবেও আখ্যা দিতে পিছপা হননি। তা ছাড়া সংসদে শেখ হাসিনা ও শেখ ফজলুল করিম সেলিম শেরেবাংলা নগরে জিয়ার মাজারকে লক্ষ্য করে বলেছেন, সেখানে জিয়াউর রহমানের লাশকে নয় বরং একটি কাঠের বাক্সকে দাফন করা হয়েছে। তারা এ স্থান থেকে জিয়ার মাজার অন্যত্র সরিয়ে দেওয়ারও কথা বলেছিলেন। এ ছাড়া শহীদ জিয়ার পরিবারকে নিয়ে কটু মন্তব্য তো হরহামেশাই করে যাচ্ছেন আওয়ামী লীগ নেতারা। তারা এসব মন্তব্য করেই থেমে থাকেননি, বরং জিয়া ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্টের নাম পরিবর্তন করেছেন। সেনানিবাস থেকে শহীদ পরিবারকে বরাদ্দ দেওয়া বাড়ি থেকে বেগম খালেদা জিয়াকে উচ্ছেদ করেছেন। শহীদ জিয়ার স্মৃতিবিজড়িত এ বাড়িটিকে রাতারাতি ভেঙে সেখানে ইতিমধ্যে নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়ে গেছে। এটা প্রতিশোধ, নাকি অন্য কিছু? এ নিয়ে কিন্তু দেশের রাজনৈতিক মহল কিংবা তথাকথিত বুদ্ধিজীবী মহলে তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখা গেল না। সমস্যা হয়ে গেল যখন তারেক রহমান তার বিভিন্ন বক্তৃতায় শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে ইতিহাসের কিছু ঘটনা তুলে ধরলেন। প্রথিতযশা ব্যক্তিদের লেখা বিভিন্ন গ্রন্থ থেকে শেখ মুজিব সম্পর্কিত বিভিন্ন ঘটনা তুলে ধরে এত দিনের প্রচলিত মিথকে চ্যালেঞ্জ করে প্রশ্নবিদ্ধ করলেন। এতেই আওয়ামী লীগ নেতাসহ তাদের দলদাস বুদ্ধিজীবী ও মিডিয়ার মাথা খারাপ হয়ে গেল। তারা শিয়ালের মতো হুক্কাহুয়া রব তুলে বলতে লাগল, ছেলেটি (তারেক) অকালপক্ব। একজন জাতীয় নেতাকে নিয়ে সে কুৎসা রটনা করে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে। এ প্রেক্ষিতে সবিনয়ে জানতে চাই, ইতিহাসের বিভিন্ন তথ্য ও রেফারেন্স উল্লেখ করে তারেক রহমান যে প্রচলিত মিথকে চ্যালেঞ্জ করে প্রশ্ন তুলেছেন তাকে নাকি আওয়ামী লীগ নেতাদের মিথ্যা-বাগাড়ম্বরপূর্ণ বক্তব্যকে কুৎসা বলব। বিচারের এ ভার পাঠকদের কাছে দিয়ে রাখলাম। লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক