বর্তমান বাস্তবতার আলোকে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান - সিরাজুর রহমান
এ বছরের পহেলা নভেম্বর তারিখটি বাংলাদেশের মানুষ বহুকাল ভুলতে পারবে না। মাঝ সকালে হঠাৎ করে গোটা দেশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে গেল একসঙ্গে। আলো ঝলমল বিপণিকেন্দ্রগুলোতে নেমে এল অন্ধকার। হসপিটালে প্রাণ বাচানো যন্ত্রপাতির জন্যও নেই বিজলি। কলকারখানা, ঘরবাড়ি, অফিস-আদালতের কাজ বন্ধ। এমনকি রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন এবং প্রধানমন্ত্রীর সচিবালয়ও ঘুরঘুট্টি অন্ধকারে। আলোর অভাবে শিশুরা লেখাপড়া করতে পারছে না। ফ্যান, এসি, টিভি, টেলিফোন, সবই অচল। বহুতল ভবনের লিফট চলছে না। এসব ভবনের চৌদ্দ-পনেরো কিংবা ষোলো তলায় যাদের বাস তাদের অবস্থা কল্পনা করতেও আতঙ্ক হয়। বিদ্যুৎ ছিল না রাতেও। মহাকাশ পরিক্রমরত কৃত্রিম উপগ্রহগুলো থেকে বাংলাদেশকে নিশ্চয়ই বিশাল এক অন্ধকারপুরী মনে হয়েছে। উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠায় ছেয়ে গিয়েছিল বাংলাদেশ। সর্বত্র একই কথা শোনা গেছে। ইনডিয়ার নিজের বিদ্যুৎ সংকট দেখা দিয়েছিল। তারা বাংলাদেশের গৃডে বিদ্যুৎ পাঠানো বন্ধ করে দেয়। তিক্ত বিদ্রুপের সুরে অনেকে আমাকে বলেছেন, ইনডিয়ার বিদ্যুৎ ইনডিয়া নিজের চাহিদা আগে মেটাবে, বাংলাদেশকে বিক্রি করবে তার পরে, কার কি বলার আছে তাতে? যুক্তি সঠিক। আপত্তি করার কিছু নেই তাতে। আরেকজন বলেন, সব ডিম এক ঝুড়িতে রাখলে যা হয়, এখানেও তা-ই হয়েছে। তারা তো আর শেখ হাসিনার সরকার নয় যে নিজে না খেয়ে সব কিছু প্রতিবেশী দেশকে দিয়ে দেবে! বাংলাদেশের কাছে যে বিদ্যুৎ ইনডিয়া বিক্রি করছে তার মধ্যে নিশ্চয়ই অভিন্ন নদীতে বাধ তৈরি করে উৎপাদিত বিদ্যুৎ আছে, আছে ত্রিপুরা রাজ্যে উৎপন্ন বিদ্যুৎও। আপনাদের মনে থাকার কথা ত্রিপুরায় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য অতিকায় যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়া হয়েছিল বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে। সে জন্য ১৩৪ চাকার ভারী ট্রেইলার নিয়ে যেতে মধুমতি নদীতে এবং এক ডজন খালে বাধ দিয়ে ্রােত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। বাংলাদেশের পরিবেশের তাতে অবর্ণনীয় ক্ষতি হয়েছে। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে আমার দেশ পত্রিকার সম্পাদক মাহমুদুর রহমান প্রায় দুই বছর ধরে জেল খাটছেন, বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলী তো গুমই হয়ে গেলেন। কিন্তু ইনডিয়ার দেখাদেখিও তো বাংলাদেশ সরকার বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করে নিজেদের দেশের চাহিদা মেটাতে পারত। ছয় বছর কি সে জন্য যথেষ্ট সময় ছিল না? তার বদলে তারা কুইক রেন্টালের নামে আত্মীয়স্বজন এবং দলের নেতাদের বিশ হাজার কোটি টাকা রাতারাতি পকেটস্থ করতে দিয়েছে। বাঙালি জাতীয়তার নামে যদি তারা ইনডিয়ান ধনপতিদের বিত্ত-সম্পদ বাড়িয়ে দিতে চায় তাহলে আরো বহু গলাধাক্কা ও হেনস্তা সইতে হবে বাংলাদেশের মানুষকে। এক মাঘে শীত যায় না, একবার যেখানে দিবারাত্রি বিদ্যুৎ বিহীন থাকতে হয়েছে দেশের মানুষকে, সেখানে বিদ্যুৎ বন্ধের ঘটনা আরো বহুবার ঘটবে। কেননা ইনডিয়ানরাই বলছে তাদের বিদ্যুৎ সংকট ক্রমেই বেশি তীব্র হয়ে উঠছে। পরনির্ভরশীলতার কারণে আরো অনেক দুঃখ আছে বাংলাদেশের কপালে। অবস্থা যেন ধনকুবেরের হাতে ভিখিরির দুটো পয়সা তুলে দেওয়া। অনেক বেশি ধনী দেশ ইনডিয়া, কিন্তু তাকে দাক্ষিণ্য দেখাচ্ছে ফতুর দেশ বাংলাদেশ। বিনা মাশুলে আমরা আমাদের নদীপথ এবং নদী ও সমুদ্রবন্দর ইনডিয়াকে অবাধে ব্যবহার করতে দিচ্ছি। তা না হলে নাকি বাংলাদেশের মানুষ অসভ্য হয়ে যাবে। শুধু বহির্বাণিজ্য নয়, উত্তর-পূর্ব ইনডিয়ার রাজ্যগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যের জন্যও তারা এখন চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের অধিকার দাবি করছে। আমাদের রেলপথ ও সড়কগুলো ইনডিয়া অবাধে ব্যবহার করবে। আমাদের অবকাঠামোই যে শুধু তাতে নষ্ট হবে তা নয়, এইচআইভি, গনোরিয়া-সিফিলিস জাতীয় যৌন ব্যাধিগুলোরও ব্যাপক আমদানি হবে বাংলাদেশে ইয়াবা ও ফেনসিডিলের মতো। ওদিকে ইনডিয়ার সঙ্গে আমাদের বাণিজ্যিক ঘাটতিতেও নতুন নতুন রেকর্ড সৃষ্টি হচ্ছে। অতিকায় দেশ ইনডিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলোর এসব সমস্যা দিব্য চোখে দেখতে পেয়েছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। তিনি বুঝেছিলেন প্রতিবেশী ক্ষুদ্র দেশগুলোর কাছে ইনডিয়া নিত্যনতুন দাবি জানাবে। দিতে অস্বীকার করার সাহস ক্ষুদ্র দেশগুলোর হবে না। বিশেষ করে বর্তমান বাংলাদেশের মতো যখন ক্ষুদ্র কোনো দেশের শাসকরা দিল্লির অধিপতিদের করুণার ওপর নির্ভর করে গদিতে টিকে থাকতে চাইবে। জিয়াউর রহমান সার্ক (দক্ষিণ আঞ্চলিক সহযোগিতা সমিতি) সংস্থাটি গঠনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন। এর অন্তর্নিহিত লক্ষ্যটি ছিল ছোট-বড় সব দেশই সমান অধিকারের ভিত্তিতে পরস্পরের সঙ্গে সহযোগিতা করবে; কোনো দেশ অন্যের কাছে অন্যায় সুবিধা চাইতে পারবে না; এক দেশ যতটুকু চাইবে তাকে দিতেও হবে ততটুকু। দিল্লিতে যারা তখন ক্ষমতায় ছিলেন তাদের উদ্দেশ্য সাধু ছিল না। তারা জিয়াউর রহমানের আদর্শে শরিক হতে রাজি ছিলেন না। সার্ককে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার এবং উপেক্ষা করার পথই তারা বেছে নিয়েছিলেন। বর্তমানে ইনডিয়ার দিক থেকে সার্কপ্রীতি আসছে এ কারণে যে, বাংলাদেশকে তারা পুরোপুরি আষ্টেপৃষ্ঠে বেধে ফেলেছে। সমান সমান অধিকার দাবি করে দিল্লির জন্য অসুবিধা সৃষ্টি আর এই ক্ষুদ্রতর প্রতিবেশীটির জন্য সম্ভব নয়। জিয়াউর রহমান বুঝে গিয়েছিলেন বড় দেশের ছোট প্রতিবেশীর বেচে থাকার চাবিকাঠিই হচ্ছে দুই সম্পত্তির মাঝখানের বেড়া মজবুত করা এবং একই সঙ্গে সম্পূর্ণ স্বাবলম্বী হওয়ার সব চেষ্টা শুরু করা। বড় প্রতিবেশীর কাছে তেল-নুনটা ধার করতে যাবেন, একদিন দেখবেন প্রতিবেশী আপনার বসতভিটেটাও দখল করে নিতে চাইছে রবীন্দ্রনাথের দুই বিঘা জমির মতো। বাঙালি জাতীয়তাবাদের পরিবর্তে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের আদর্শ প্রচার করে জিয়া দুই সম্পত্তির মধ্যকার বেড়াই মজবুত করতে চেয়েছিলেন। আর স্বাবলম্বী হওয়ার ধ্যানধারণার কথা ক্ষমতাপ্রাপ্তির গোড়াতেই খুলে বলেছিলেন আমাকে। অগতির গতি নেতা জিয়াউর রহমান সব বিচারেই অগতির গতি গোছের নেতা ছিলেন। একাত্তরের মার্চ মাসে দেশ টগবগ করে ফুসছিল। জয়দেবপুরে, চট্টগ্রাম বন্দরে বাংলাদেশি সেনাসদস্য আর সাধারণ মানুষের সশস্ত্র প্রতিরোধ শুরু হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আন্দোলনের নেতা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার স্বপ্নে বিভোর। পাকিস্তানিরা পূর্ব পাকিস্তানে সমরশক্তি বৃদ্ধির জন্য সময় নিচ্ছিল। আমার বড় ভাই পাকিস্তান বিমান বাহিনীর র‌্যাডার বিশেষজ্ঞ এবং শেখ মুজিবুর রহমানের কলকাতা ইসলামিয়া কলেজের বন্ধু গ্রুপ ক্যাপ্টেন এ বি এম মাহবুবুর রহমান করাচি থেকে লোক পাঠিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে সতর্ক করে দিয়েছিলেন। মুজিব সেটা গায়ে না মেখে বলেছিলেন, মাহবুব আমাকে ভালোবাসে। ওকে বলে দিও অনর্থক চিন্তা না করতে। সেই হুশিয়ারির কথা জানাজানি হওয়ার পর আমার ভাইকে ৬৬ দিন ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে নির্যাতন করা হয়েছিল। পূর্ব পাকিস্তানের পরিস্থিতি শান্ত হয়ে এলে তাকে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী করা হবে জেনারেল ইয়াহিয়া খানের এ আশ্বাসে বিশ্বাস করে শেখ মুজিবুর রহমান পশ্চিম পাকিস্তানে চলে গেলেন। এদিকে ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সৈন্য হট হেডদের মাথা ঠা-া করার জন্য পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের ওপর ঝাপিয়ে পড়েছিল। তখন আর পিছু হটার সময় ছিল না। মেজর জিয়াউর রহমান এগিয়ে এসে আন্দোলনের হাল ধরলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচার করলেন। পরবর্তীকালে আওয়ামী লীগে মুজিবের ডান হাত এবং ইনডিয়ায় নির্বাসিত সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ, মুক্তিযুদ্ধের উপপ্রধান সেনাপতি এয়ার মার্শাল এ কে খন্দকার, মুজিবের সেনাপ্রধান জেনারেল সফিউল্লাহসহ অনেক দায়িত্বশীল ব্যক্তি জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণার কথা বলে গেছেন। পচাত্তর সালে কয়েকজন বিদ্রোহী সেনাকর্মকর্তা আজীবন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যা করে। তারা আওয়ামী লীগ নেতা হিসেবে মুজিবের সমসাময়িক এবং তার সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার মোশতাক আহমদকে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে চাপ দেয়। তিনি মুজিব সরকারের আটজন মন্ত্রীকে নিয়ে একটি আওয়ামী লীগ দলীয় সরকার গঠন করেন। কিন্তুইনডিয়া সে সরকারের ওপর ভরসা করতে পারেনি। ইনডিয়াপন্থী বলে বিদিত জেনারেল খালেদ মোশাররফ একটি রক্তক্ষরা অভ্যুত্থান ঘটান। খালেদ মোশাররফ সেনাপ্রধান জেনারেল জিয়াউর রহমানকে গৃহবন্দি করেন। সেনাবাহিনীর কয়েকজন অফিসার এবং গরিষ্ঠসংখ্যক সাধারণ সৈনিক খালেদ মোশাররফের বিরুদ্ধে রুখে দাড়ান। ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে-বাইরে প্রচুর প্রাণহানি হয়েছিল। অবশেষে ইনডিয়ায় পালিয়ে যাওয়ার সময় খালেদ মোশাররফ সাধারণ সৈনিকদের হাতে ধরা পড়েন এবং গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। সাধারণ সৈনিকরা ফটক ভেঙে জিয়াকে মুক্ত করেন এবং সেনা সদর দফতরে নিয়ে যান। কা-ারি বিহীন রাষ্ট্রের হাল শক্ত হাতে না ধরে জিয়ার গত্যন্তর ছিল না। বাংলাদেশকে তিনি মনেপ্রাণে ভালোবাসতেন। সাক্ষাৎকার নয়, আলোচনা তিন মাস পরে ১৯৭৬-এর ফেব্রুয়ারি মাসে তার সেনানিবাসের অফিসে জেনারেল জিয়ার সাক্ষাৎকার নিতে যাই। তিনি নিজে এগিয়ে এসে আমাকে অভ্যর্থনা করেন। আমার হাত থেকে টেপ রেকর্ডার, মাইক্রোফোন, ক্যামেরা, ইত্যাদি নিয়ে তিনি তার পিএস কর্নেল অলির হাতে দিলেন। বললেন, ওলি, এগুলো প্রাণ দিয়ে রক্ষা করো; রাইফেল যেমন তোমার-আমার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, এগুলো মি. রহমানের জন্য সমানেই গুরুত্বপূর্ণ। আমাকে তার খাস দফতরে নিয়ে যেতে যেতে তিনি বললেন, সাক্ষাৎকার নয়, আমি আপনার সঙ্গে দেশের জটিল সমস্যাগুলো এবং আমার চিন্তাভাবনা নিয়ে আলোচনা করতে চাই। প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে অনেক কথাই তিনি আমাকে বলেছিলেন। চুয়াত্তরের মন্বন্তরের স্মৃতি তার মনে তখনো তাজা। খাদ্যোৎপাদন বৃদ্ধির সব চেষ্টা অবিলম্বে শুরু করতে হবে এবং সেনাবাহিনীর শৃঙ্খলা। সেনাবাহিনীর নিজের কিছু সমস্যা আছে (তিনি রক্ষী বাহিনীর হত্যাযজ্ঞ, এ বাহিনীকে জাতীয় সেনাবাহিনীর চেয়ে অনেক বেশি পক্ষপাতিত্ব দেখানোর ইঙ্গিত দিচ্ছিলেন)। তা ছাড়া বাইরের কিছু লোক উসকানি দিয়ে সেসব সমস্যা বাড়িয়ে তুলেছে। জিয়া বলেন, সেনাবাহিনীতে চেইন অফ কমান্ড ফিরিয়ে আনা তার প্রথম ও প্রধান কাজ হবে। তিনি বলেন, এর পরের সমস্যা হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের সময়কার এবং পরবর্তী কিছু ঘটনার কারণে (তিনি ৯৩ হাজার পাকিস্তানি সেনাকে মুক্তিদান অথচ কিছু বাংলাদেশির বিরুদ্ধে প্রতিশোধ বাসনার প্রতি ইঙ্গিত করছিলেন) সমাজে ও জাতিতে বিরাজমান উত্তেজনা। তিনি বলেন, এই লোকগুলো তো এ দেশেরই লোক। এদের নিয়ে আমি কি করব? আর কোনো দেশ কি তাদের নেবে? নেবে না। তাহলে আমি কি করব এদের নিয়ে? এদের কি আমি বঙ্গোপসাগরে ফেলে দিয়ে আসব? জেনারেল জিয়াউর রহমান বলেন, এই লোকগুলোকে জাতীয় জীবনে সম্পৃক্ত করা না হলে তারা পিঠে ছুরি মারবে। পিঠ বাচানোর চিন্তায় যদি আমি সব সময় ব্যস্ত থাকি তাহলে দেশের কাজ করার সময় পাবো কখন? জিয়ার কথা জিয়ার কাজ জিয়া বলেন দেশ ছোট, সম্পদ কম, কিন্তু জনসংখ্যা খুব বেশি। বেকার, বিশেষ করে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা খুব বেশি। সঠিকভাবে কাজে লাগানো গেলে এরা বিরাট সম্পদ হতে পারত। কিন্তু বেকার থাকলে এরা সামাজিক ও রাজনৈতিক সমস্যা সৃষ্টি করবে। তিনি বলেন, এদের উৎপাদনশীল কাজে কিভাবে ব্যস্ত রাখা যায় আমি সিরিয়াসলি সে চিন্তা করছি। একটা সম্ভাবনা হচ্ছে এদের নিয়ে সমবায় পদ্ধতিতে শ্রমশিল্প গড়ে তোলা। তাতে একসঙ্গে দুই রকমের ফল পাওয়া যাবে। জিয়া বলেন, প্রতিবেশী দেশ অভিন্ন নদীতে বাধ তৈরি করছে, তাতে প্রয়োজনের সময় আমরা নদীর পানি পাচ্ছি না। আমাদের কৃষি তাতে ব্যাহত হচ্ছে। কিন্তু আমাদের বেচে থাকতে হবে। নদী আর খালগুলোর সংস্কার করে এবং পানি ধরে রাখার জন্য বড় বড় জলাশয় তৈরির কথা আমি ভাবছি। জিয়া বলেন, বাংলাদেশের মানুষ একরোখা। তাদের গণতন্ত্র না দিলে চলবে না। আর সংবাদপত্রকেও স্বাধীনতা দিতে হবে। শিগগিরই আমি পত্রপত্রিকার ওপর থেকে সব বিধিনিষেধ তুলে নেওয়ার পরিকল্পনা করেছি। আর বাকশালীরা তো সব রাজনৈতিক দল বেআইনি করে দিয়েছে। সেসব দলকে আবার চালু করে কিভাবে গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা যায় সে সম্বন্ধে ইউনিভার্সেটির কয়েকজন প্রফেসরসহ বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছি। লন্ডনে ফিরে এসে পরবর্তী কিছুকাল আমি জেনারেল জিয়াউর রহমানের কাজ ও কথাগুলোর দিকে সতর্ক দৃষ্টি রেখেছি। তার কথা ও কাজের মিল কতখানি, সেটাই আমার দেখার বিষয় ছিল। দেখেছি আমাকে তিনি যা যা বলেছিলেন তার সঙ্গে তার কথা ও কাজগুলো হুবহু মিলে যাচ্ছে। তিনি সংবাদপত্রের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে দিলেন এবং আওয়ামী লীগসহ সব দলকে আবার বৈধ ঘোষণা করলেন, নতুন রাজনৈতিক দল গঠনও বৈধ হলো। নিজেও তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল বিএনপি গঠন করেছিলেন। বিশেষ করে শিক্ষিত বেকারদেরসহ জাতীয় জীবনের সর্বস্তরের নরনারীকে নিয়ে তিনি খাল খনন ও নদী সংস্কারের কাজে আত্মনিয়োগ করলেন। নিজেও তিনি মাটি কেটেছেন বিভিন্ন স্থানে। প্রায় একই সময়ে তিনি দেশের সার্বিক বিকাশের লক্ষ্যে তার ঐতিহাসিক ১৯ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করেন। ১৯ দফায় এবং বিএনপির কর্মসূচির মধ্যে সমবায় পদ্ধতিতে কৃষি ও শ্রমশিল্পের উন্নয়নের কথা তিনি জোর দিয়ে বলেছেন। নতুন প্রজন্মের চরম অধঃপতন সমবায় পদ্ধতির উন্নয়ন রাষ্ট্রের সম্পদের সুষম বণ্টনের প্রকৃষ্ট উপায় বলে জিয়াউর রহমান বুঝতে পেরেছিলেন। কিন্তু বর্তমান বাংলাদেশে যা ঘটেছে এবং ঘটছে সেটা জিয়ার স্বপ্নের বাংলাদেশের পুরোপুরি বিপরীত। পাকিস্তানি আমলে বলা হতো দেশের সম্পদের গরিষ্ঠ অংশের মালিক ২২টি পরিবার। বর্তমান বাংলাদেশে সে সংখ্যা সম্ভবত ২২০০ হবে। দেশের মোট সম্পদের ৯৫ শতাংশ ইতিমধ্যে এদের হাতে চলে গেছে। অবশিষ্ট মানুষ কোনোমতে খুড়িয়ে খুড়িয়ে জীবনের গাড়ি ঠেলছে। বর্তমান অবস্থা চলতে থাকলে এরা আরো শোষিত হবে, চাকর-বাকর শ্রেণীতে চলে যাবে তারা। দেশ ও জাতির কথা নতুন প্রজন্ম এখন আর ভাবছে না। উৎপাদনশীল কর্মের পরিবর্তে ভাড়াটে গু-ামি, লুটপাট, ছিনতাই, ধর্ষণ, হত্যা এসবে লিপ্ত হচ্ছে আজকের নতুন প্রজন্ম। ইনডিয়া যা চাইছে আগ বাড়িয়ে তার চেয়েও বেশি দিচ্ছে আজকের সরকার। এ ক্ষেত্রে দেওয়াটাই সার হচ্ছে, বিনিময়ে আমরা কিছু পাচ্ছি না। এমনকি চুক্তিবদ্ধ অঙ্গীকারগুলোও পালন করছে না প্রতিবেশী দেশ। ১৯৭৪-এ শেখ মুজিব ও ইন্দিরা গান্ধীর স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী স্থলসীমা স্বাভাবিকীকরণ আজো হয়নি। নানা অজুহাত দেখিয়ে এবং ধানাইপানাই করে ইনডিয়া বাংলাদেশের প্রাপ্য ভূখ-গুলো হস্তান্তর করছে না। অভিন্ন নদীগুলোর পানির ন্যায্য হিস্যা ভাটির দেশগুলোকে দেওয়া আছে জাতিসংঘ সনদ এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইনে। কিন্তু অন্তত ৩৫টি নদীতে বাধ বেধে ইনডিয়া ন্যায্য অধিকার থেকে বাংলাদেশকে বঞ্চিত করছে। তার পরও বিনা তদন্ত, বিনা আপত্তিতে টিপাইমুখে বাধ তৈরির সুযোগ বাংলাদেশ সরকার ইনডিয়াকে দিয়ে দিয়েছে। তিস্তা নদীর পানিবণ্টন সম্বন্ধে চুক্তি করবে বলে কয়েক বছর ধরে বলে আসছে ইনডিয়া। এখানেও স্থলসীমা চুক্তির মতো ধানাইপানাই করে কালক্ষেপণ করছে ইনডিয়া। ১৯৯৬-এ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইনডিয়ার প্রধানমন্ত্রী দেবগৌড়ার সঙ্গে ফারাক্কায় গঙ্গার পানিবণ্টন সম্বন্ধে চুক্তিতে সই করেছিলেন। সেই চুক্তি অনুযায়ী পানি বাংলাদেশ কোনো বছরই পায়নি। এখন আবার গঙ্গার উজানে আরো ১৬টি বাধ তৈরি করছে ইনডিয়া। তার পরে যে বাংলাদেশের ভাগ্যে আরো কম গঙ্গার পানি জুটবে, শিশুও সেটা বোঝে। ভাবছি, শহীদ জিয়ার আদর্শ অনুসরণ করে চললে বাংলাদেশের পরিস্থিতি এমন হতে পারত কি না। লন্ডন, ০৪.১১.২০১৪