কয়েকজন বিশ্বনেতার চোখে জিয়া - আলমগীর মহিউদ্দিন
শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের স্মৃতিচারণায় এ কথাই মনে হয়, মানুষের পরিচয় তার কর্মে, শুধু বাক্যে নয়। কর্মবীর মানুষ মানবকল্যাণে রত থাকেন। আর প্রচারধর্মী তারাই যারা অন্তরালে রাখে তাদের স্বার্থ। আজকের প্রচারের ডামাডোলে কর্মবীর অনুকরণীয় ব্যক্তিত্বকে স্বার্থবাদীরা বিভ্রান্তির বেড়াজালে জড়িয়ে নিজেদের উপস্থাপন করছে। ফলে সমাজে সংঘাত, সহিংসতা ও স্বার্থপরতার অবয়ব বাড়ছে, আর সেই সাথে হারিয়ে যাচ্ছে মূল্যবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা, সর্বোপরি নৈতিকতানির্ভর জীবনব্যবস্থা, যা আবহমানকাল ধরে চলে আসছিল। শহীদ জিয়া ছিলেন এমনই অনুকরণীয় কর্মবীর। শহীদ জিয়া সম্পর্কে ইউরোপের একজন রাজা, একজন বিরোধীদলীয় নেতা (যিনি পরবর্তীকালে প্রধানমন্ত্রী হন), একজন কিংবদন্তির নেতা, একজন গণ-আন্দোলনের (কেউ কেউ তাকে বিচ্ছিন্নতাবাদী নেতাও বলেন) আমার কাছে প্রায় এই একই ধরনের মন্তব্য করেছিলেন। আমরা বাইশটি দেশের সাংবাদিক ব্রাসেলসে রাজার সাথে সাক্ষাৎকারের জন্য আমন্ত্রিত। ইউরোপিয়ান ও আমেরিকান সাংবাদিকদের প্রস্তুতি ও আলোচনার বহর দেখে আমি বিস্মিত হলাম। কেউ কেউ নতুন পোশাক কিনল। প্রাসাদে যখন পৌছালাম, মহিলা সাংবাদিকদের থেকে চোখ ফেরানোই যেন মুশকিল হচ্ছিল। প্রসাধনে, পরিচ্ছদে ও অঙ্গাভরণে একেবারে অন্য মানুষ। কেমন করে বাউ করতে হবে, তারপর একটু হাটু ভাঙতে হবে ইত্যাদির মহড়াও হলো কিছুক্ষণ। সারিবদ্ধভাবে আমরা দাড়িয়ে, রাজা এলেন, দেখলাম মহড়ার পুরো নাটকীয় অপূর্ব দৃশ্য। দেশের আদ্যাক্ষর অনুসারে আমাদের পরিচিত করা হলো। বাংলাদেশ বি হওয়াতে দুই নাম্বারেই সুযোগ পেলাম। রাজা হাত বাড়ালেন। আমি সালাম দিয়ে হাত বাড়ালাম। রাজা আমার হাত ধরেই বলেন, জানো, তিনি একজন ভিশনারি নেতা। নদী ভ্রমণের সময় তার ইচ্ছার কথা জানিয়ে আমার সাহায্য চাইলেন। তোমরা তো জানোই বেলজিয়াম তোমাদের দেশের চেয়েও ছোট। তবে আমরা তোমাদের পাশেই থাকব। আমি প্রথমে বুঝতে পারিনি রাজা কার কথা বলছেন। যখন নদী ভ্রমণের কথা বললেন, বুঝলাম তিনি জিয়াউর রহমানের কথা বলছেন। আমি বললাম, ইয়োর মেজেস্টৃ, আপনার অনুভূতির জন্য আমি কৃতজ্ঞ। তখন তিনি বললেন, তিনি (জিয়া) বলেছেন, সময় কম, কিন্তু কাজ অনেক বেশি। তবে আমাদের মানবসম্পদ অপূর্ব। তাদের কাজে লাগাতে হবে। রাজা হ্যান্ডশেক একটু আলগা করতেই হাত সরিয়ে নিলাম এবং বাংলাদেশে আবার আসার জন্য আমন্ত্রণ জানালাম। আমাদের দর্শনপর্ব শেষ হওয়ার পর সবাই চেপে ধরল, তোমার সাথে রাজা এতো কি কথা বলল, বলো। আমি বললাম, এটা এক্সক্লুসিভ। তাদের আগ্রহের কারণ, রাজা সবার সাথে একটু হ্যান্ডশেক, একটু হাসি এবং মাথা নোয়ানো ছাড়া কিছুই করেননি। শহীদ জিয়া নিশ্চয়ই তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে থাকবেন, নতুবা সে দেশের সাংবাদিককে এতো সময় দিতেন না। রাজার জিয়াকে ভিশনারি বলে বর্ণনা আমাকে আকৃষ্ট করল। যখন স্পেনে এক অ্যাসাইনমেন্টে তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেতা সুয়ারেজের সাথে সাক্ষাৎ করি, তিনিও ঠিক একই কথা বললেন। বললেন, তোমাদের নেতা রেভল্যুশন করেছেন সত্যি, কিন্তু এত কাজ একসাথে শুরু করেছেন; সবগুলো সমাপ্ত করতে পারলেই তবে সত্যিকারের ফল পাওয়া যাবে। তার উনিশ দফা বাস্তবায়নে বহু বছর লাগবে। কাজগুলো শুরু করলে তা তার পরের ক্ষমতাসীনরা চালু রাখবে তো? সুয়ারেজ পরে প্রধানমন্ত্রী হন। তার কথাই সত্য বলে মনে হচ্ছে আজ। স্পেনের বিচ্ছিন্নতাবাদী সংগঠন, এটা দেশটির একটা অংশে বাস্কবলে স্বাধীন অথবা স্বায়ত্তশাসন চায়। কয়েক যুগ ধরে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চলছে। তাদের নেতৃবৃন্দের (হুডেড) সাথে দেখা হয় বিলবাওতে। তারা দেখলাম বাংলাদেশের রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা আন্দোলন, জিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণার কথা জানে। এবং বলল, উনিশ দফা বাস্তবায়ন করতে হলে জনগণের বাহিনীর প্রয়োজন হবে। জার্মানির চ্যান্সেলর উইলি ব্রান্ডট প্রকাশ করেন নর্থ-সাউথ সম্পর্কসহ বিশ্ব পরিস্থিতিতে তৃতীয় বিশ্বের অবস্থানের ওপর ব্রান্ডট রিপোর্ট। এশিয়া থেকে আমি সে রিপোর্টের ওপর মন্তব্যের জন্য সাক্ষাৎ চাইলে তিনি মাত্র পনেরো মিনিটের জন্য সময় দিলেও তা বেশ দীর্ঘ হয়। ব্রান্ডট বললেন, তার রিপোর্ট মনিটরিংয়ের জন্য কিছু রাষ্ট্রপ্রধানের সমন্বয়ে গঠিত একটি কমিটি করার প্রস্তাব তিনি করেছেন। তোমাদের প্রেসিডেন্টও থাকবেন, কারণ উন্নয়নশীল প্রধান দেশগুলোর মধ্যে রাষ্ট্রের তিনি প্রধান। তিনি জিয়ার দারিদ্র্য নিরসনের নানা প্রোগ্রামের প্রশংসা করলেন। প্রশ্ন করলাম, এ কমিটিতে কি ভারত আছে? তিনি জবাব দিলেন, ভারত তো এখন বিশ্বের অষ্টম শিল্পোন্নত দেশ। তাদের দরিদ্র জনগণের জন্য বাইরের সাহায্যের চেয়ে নিজেদের সঠিক কর্মকা-ই বেশি প্রয়োজন। এ রিপোর্ট তাদের আংশিক স্পর্শ করবে বলে জানান। চ্যান্সেলর ইউলি তখন একটি ড্রাফট রিপোর্ট দিলেন। ব্রান্ডট বললেন, জিয়ার জনগণকে নানা কর্মকা-ে সম্পৃক্ত করার প্রচেষ্টা দ্রুত দারিদ্র্য নিরসনে সহায়তা করবে। আর বিশ্ব পরিস্থিতির কারণে উইলির সে বিখ্যাত রিপোর্টটি কখনোই বাস্তবায়ন হয়নি। শহীদ জিয়া স্বল্প সময়ে বিশ্ব অঙ্গনে তার ছাপ ফেলতে পেরেছিলেন। এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী নিজেও এক মন্তব্যে এর প্রতি ইঙ্গিত করেছিলেন। মন্তব্যটির কথা বলেছিলেন তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডিজিইপি নাজিমুদ্দিন হাসেম। শহীদ জিয়া ভারতে গেছেন। এয়ারপোর্টে তাকে গার্ড অফ অনার দেওয়া হচ্ছে। মঞ্চে বসে আছেন ইনডিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী ও প্রেসিডেন্ট। ভারতীয় প্রেসিডেন্ট জিয়ার স্যালুট নেওয়া দেখে ইন্দিরাজীকে বললেন, কোয়াইট স্মার্ট, ইজনট্ ইট। ইন্দিরাজী সে কথার সম্পূরক করে বললেন, অলসো ইনটেলিজেন্ট। উই হ্যাভ টু ওয়াচ হিম ক্লোজলি। হাসেম ভাই বললেন, তিনি তাদের পেছনের সারিতে অনেক কাছে বসেছিলেন, তাই তাদের কথা স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছিলেন। এটা সত্য যত দিন জিয়া বেচে ছিলেন তত দিন তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্রের মতো কথা বলেছেন। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের সরব উপস্থিতি ছিল। সেখানে ভারত হয়ে পড়েছিল নিষ্প্রভ। যখন ইরাক-ইরান যুদ্ধ বিরতির জন্য ওআইসি তিন সদস্যের প্রতিনিধি পাঠানোর প্রস্তাব করল তখন দেখা গেল দুটি দেশ বাংলাদেশের জিয়াকেই শুধু গ্রহণ করতে রাজি হলো। আমি জিয়ার কথা প্রথমে শুনেছিলাম করপোরাল জহুরের কাছে। জহুর এর এক-দেড় যুগ পরে আগরতলা ষড়যন্ত্রের অভিযুক্ত হিসেবে সার্জেন্ট জহুর নামে প্রত্যেক বাংলাদেশির হদয়ে স্থান করে নেন। জহুর তার শিক্ষার্থীদের, বিশেষ করে যদি সে বাংলাভাষী হয়, বলতেন একজন সাহসী, নির্ভীক তরুণ অফিসারের প্রতিবাদের কর্মকা-। সে অফিসার তার সামনে কোনো অন্যায় সংঘটিত হতে থাকলে তাৎক্ষণিক প্রতিবাদ করতেন অথবা প্রতিহত করার চেষ্টা করতেন। এমন একটি ঘটনার বর্ণনা তিনি দিতেন প্রায়ই। সে অফিসার দেখতেন পাঞ্জাবি ট্রেইনিরা প্রায়ই মেস থেকে বাগান-মাঠের মধ্য দিয়ে হেটে ফিরছে তাদের রুমে। এমনভাবে মাঠ পেরনো ছিল নিষিদ্ধ। তিনি লক্ষ করলেন, অপাঞ্জাবিদের ব্যাপারে নিয়মটা কার্যকর করা হয় না। একদিন তিনি তাদের সাথে মাঠের মধ্য দিয়ে যেতে যেতে যখন মধ্যমাঠে এসেছেন তখন এক পাঞ্জাবি ট্রেইনিকে ধরে ফেলে এমন নিয়ম ভঙ্গ কেন করা হচ্ছে, তা জানতে চাইলেন। শোরগোলে ট্রেইনিং একাডেমির শান্তিরক্ষীরা ব্যাপারটিকে নজরে নিতে বাধ্য হলেন। এরপর থেকে আর সে নিয়ম ভঙ্গ করতে কেউ সাহস পায়নি, বরং সেই তরুণ অফিসারটির নাম শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করা হতো যখনই কেউ এমন নিয়ম ভঙ্গের চেষ্টা করত। এ অফিসারটিই হলেন জিয়াউর রহমান। তার কণ্ঠ প্রথম যখন শুনলাম, তা-ও বেতার তরঙ্গে, একটি চলমান মুহূর্তের জন্য সার্জেন্ট জহুরের কথা মনে এল। এ সেই জিয়াউর রহমান তো নন? তার কণ্ঠও শুনলাম এক বিশেষ অবস্থায়। তখন দেশবাসী উৎকণ্ঠায়, অনিশ্চয়তায়। পাকিস্তান আর্মি ঝাপিয়ে পড়েছিল। সবাই নিরাপত্তার জন্য ছোটাছুটি করছিলেন। আমরা কয়েকজন রোগী হিসেবে পিজি হসপিটালে (বর্তমানের ডিএমসির জরুরি বিভাগ) এক বেডে আশ্রয় নিয়েছিলাম, এ আশায় মিলিটারিরা হসপিটালে অবশ্যই আসবে না। সন্ধ্যার পরেই ভীতির রাজ্য বিরাজ করত। হসপিটালে শোনা যেত নানা ভয়ংকর কাহিনী। আমার পাশের বেডে স্থান নিয়েছিলেন সচিবালয়ের দিলীপ বাবু। আমাকে উনি দুলাভাই বলতেন, তার স্ত্রী আমার গিন্নির সহকর্মী ছিলেন বলে। দিলীপ বাবু সর্বক্ষণ তার ছোট্ট রেডিওতে কান লাগিয়ে থাকতেন কি নির্দেশ-উপদেশ আসে তা শোনার জন্য। তখন একটু তন্দ্রার মতো লাগছিল, ঠিক এমন সময় দিলীপ বললেন, দুলাভাই, মেজর জিয়া স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। শোনেন, বলেই রেডিওটা যতটুকু বাড়ানো সম্ভব বাড়ালেন। শোনা গেল, একজন মেজর জিয়া নিজেকে প্রেসিডেন্ট হিসেবে বর্ণনা করে স্বাধীন বাংলাদেশের ঘোষণা দিচ্ছেন। অন্যান্য বেডের সবাই ছুটে এল। দিলীপ বাবু বললেন, যুদ্ধ তো শুরু হয়ে গেল। শেখসাহেবের কি হবে? সাবধানে সবাই বারবার সেই ক্ষীণ আওয়াজের ঘোষণা শোনার জন্য নব ঘোরাচ্ছিলেন। পরদিন শোনা গেল, ঘোষণায় একটু পরিবর্তন। মেজর জিয়া নিজেকে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করছেন। কেউ কেউ মন্তব্য করলেন, তিনি রাজনীতিবিদ নন, তাই রাজনীতিবিদের সহায়তা নিলেন। তবে সবাই শেখসাহেব কোথায় তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেন। তখনো আনুষ্ঠানিকভাবে পাকিস্তান সরকার ঘোষণা দেয়নি শেখসাহেবকে তারা বন্দি করেছে। আমি বললাম, শেখসাহেব এখন অন্তরীণ। কেমন করে তা জানলাম তার বর্ণনা দিলাম। কলাবাগানের যে বাড়িতে ভাড়া থাকতাম, তার মালিক ছিলেন ড. শামসুদ্দিন। তৎকালীন পাক-সিয়াটো ল্যাবরেটরির (বর্তমানে আইসিডিডিআরবি) সুপার। তিনি একজনকে কেয়ারটেকার রেখেছিলেন। তার ভাতিজা রশিদ আমাদের গৃহকর্মে সাহায্য করত। আর রশিদের খালা শেখ সাহেবের বাসায় ঠিকা কাজ করত। ২৫ মার্চে রাত একটার দিকে নানা ফাক দিয়ে বাসায় ফিরে এসে প্রথমেই আমাদের অংশে এসে আমাকে ডাকছিল। আমরা তখন ভয়ে ভাড়ার ঘরে চুপ করে বসে আছি। রশিদের খালা বলল, খালু, আর্মি এখনই শেখসাহেবকে ধরে নিয়ে গেল। এর দুই দিন পরে খবরের কাগজে ছবি দিয়ে পাকিস্তানিরা খবর দিল শেখসাহেবের অন্তরীণ হওয়ার ঘটনা। শহীদ জিয়া নির্ভীক ও অন্যায়ের প্রতিবাদী ছিলেন যেমন সত্য, তেমনি সাধারণ মানুষের খুব কাছে যেতে পছন্দ করতেন। তাদের সুখ-দুঃখের ভাগী হতে চাইতেন। তার গ্রামের পথে চলা একটা কিংবদন্তি হয়ে গিয়েছিল। তার এমন হাটার প্রথম সফরসঙ্গী ছিলেন বেশ কিছু সাংবাদিক। কুষ্টিয়ার সেই সফর এখন স্মৃতি। তিনি রাত কাটালেন তাবুতে। যখন আমরা কুষ্টিয়ার উদ্দেশে যাত্রা শুরু করলাম তখন বেশ বেলা হয়েছে। রাষ্ট্রপতি জিয়ার পাশাপাশি হাটছি। হঠাৎ আমাদের দিকে তাকিয়ে দূরের গ্রামগুলোর দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে জিজ্ঞেস করলেন, বলতে পারেন, এ গ্রামবাসীরা কখনো দালানে বাস করতে পারবে কিনা? বললাম, সম্ভবত কখনো না। দুশ বছরেও না, যদি বর্তমান আর্থিক অবস্থা চালু থাকে। রাষ্ট্রপতি জিয়া বললেন, না, সম্ভব যদি আমরা কোয়ান্টাম লিপ দিতে পারি। পথে চলতে চলতে সিকিউরিটির নির্দেশিত পথে না চলে, সোজা গ্রামের মধ্যে চলে যেতেন। সাধারণ মানুষকে তাদের সুখ-দুঃখের কথা জিজ্ঞেস করতেন। তার কুষ্টিয়ার হাটার প্রোগ্রামের বছর দুই পর ওই এলাকায় যেতে হয়েছিল। হঠাৎ মনে হলো যে বাড়িটির ওপর দিয়ে তিনি হেটে গিয়েছিলেন, তারা তাকে মনে রেখেছে কি না! গিয়ে বিস্মিত না হয়ে পারিনি। সে বাড়ির যতটুকু এলাকার ওপর তিনি হেটে গিয়েছিলেন এবং যেখানে দাড়িয়ে কথা বলেছিলেন, তা বাশের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে স্মৃতি হিসেবে। আসলে গত পঞ্চাশ বছরের আমার সাংবাদিকতার জীবনে এমন হাটার প্রোগ্রাম শুধু মওলানা ভাসানী ছাড়া আর কোনো নেতাকে নিতে দেখিনি। তিনি মানুষকে স্বল্পতম সময়ে জানতে, বুঝতে চাইতেন। একবার বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে সারা দেশের ইউনিয়ন লেভেলের লোকদের নিয়ে একটা মিটিং করলেন। তাদের সমস্যা শোনা এবং সমাধানের চেষ্টা করলেন। লক্ষ করলাম, তিনি সব শেষের সারির মানুষটিকে তার নাম ধরে ডাকলেন। বক্তব্য দেওয়ার জন্য বললেন। আমি মানুষের চেহারা ভুলে যাই। অথচ অসংখ্য মানুষের চেহারা জিয়া মনে রাখতেন। ওই ভ্রমণের আগে সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের খাওয়া-দাওয়ার কথা জিজ্ঞাসা করলেন। সাংবাদিকরা ভ্রমণের জন্য ডিএ পায় কি না এবং তাদের সমস্যা। বন্ধুবর ফাজলে রশিদ সম্ভবত তার বেতনের কথা জিজ্ঞাসা করলেন। জিয়ার জবাব শুনে আমরা থ। কারণ আমরা কয়েকজন তখন তার চেয়ে বেশি বেতন পাই। তিনি স্থানীয় অফিসারদের বলে দিয়েছিলেন ফ্রুগাল হওয়ার জন্য। সংবাদপত্রের উন্নয়ন এবং সত্যিকারের জনগণের সেবক হওয়ার জন্য বলতেন। পিআইবি তার অন্যতম কীর্তি। তাদের প্লট দিয়েছেন। সাংবাদিকরা সচ্ছল থাকুক, কারো দ্বারা প্রভাবিত না হোক তিনি তা চাইতেন। তার এক স্টাফ একবার আমাকে বললেন, জিয়া সকালের শেভ করতে করতে দেশের পত্রিকাগুলো পড়ে ফেলে তাৎক্ষণিক অনেক বিষয়ের খোজখবর নিতেন। তা টের পেলাম এক ঘটনায়। তখন আমি বাংলাদেশ টাইমসে। আমাদের চৌকস রিপোর্টার নাফা এক বৃদ্ধকে ভ্যাসেকটমি হওয়ার কাহিনী আনল। আমরা দ্বিধাদ্বন্দ্বের মধ্যে তা ছাপলাম। পরদিন সকাল আটটার দিকে নাশতা করতে বসেছি, এমন সময় ফ্যামিলি প্ল্যানিংয়ের বড় কর্মকর্তা টেলিফোন করলেন। বললেন, ভাই, আপনাদের ভ্যাসেকটমির খবরটা আমার চাকরি নেওয়ার ব্যবস্থা করেছে। আমি কিছুই জানি না। একটু সাহায্য করবেন তার কিছু ডিটেইল দিয়ে। পরে জানলাম, রাষ্ট্রপতি জিয়া খবরটা পড়েই সেই অফিসারকে সেদিনের মধ্যেকিব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে তা জানাতে বলেছেন, নতুবা তাকে অফিশিয়াল প্রসিডিউর ফেস করতে হবে। পরে জানা গেল ঘটনাটি সত্য। লোকাল অফিসাররা কর্মটি করেছে পয়সার জন্য। এখানে শহীদ জিয়ার দুর্নীতির বিরুদ্ধে অভিযানের কথা মনে পড়ল। তবে তিনি তা দৃষ্টান্ত দিয়ে পরিচালনার চেষ্টা করতেন। টাইমসে তখন অনেক ইনভেস্টিগেটিভ রিপোর্ট ছাপা হতো। চাল সিন্ডিকেটসহ নানা খবর। এর মধ্যে একদিন এক ভদ্রলোক একটি বড় ফাইল নিয়ে এসে হাজির। তিনি পুলিশের সাবেক কর্মকর্তা বলে পরিচয় দিয়ে বললেন, সাফদারসাহেবের নেতৃত্বে বঙ্গবন্ধু একটি কমিটি করেছিলেন ঢাকা-আরিচা রোডের বিশাল দুর্নীতি তদন্তের জন্য। কিন্তু তার ইন্তেকাল হওয়ায় বোধ হয় এ তদন্তে ভাটা পড়বে। আপনাদের লেখায় দেখি কাজ হচ্ছে। এ রিপোর্টটা যদি করতেন। সে কাজের ভার দেওয়া হলো আমাদের আর এক এক্স-রিপোর্টার খন্দকার মুনিরুল আলমকে। তিনি বহু পরিশ্রম করে সম্ভবত পাচ পার্টে একটি প্রতিবেদন তৈরি করলেন। প্রথা অনুযায়ী আমরা সম্পাদকের নেতৃত্বে রিপোর্টটা আলোচনা করার সময় সম্পাদক বললেন, আগামীকাল আমার রাষ্ট্রপতির সাথে সাক্ষাৎ আছে। দিন রিপোর্টগুলো নিয়ে তার সাথে আলাপ করব। আমরা খুশিই হলাম। প্রায় দুই সপ্তাহ পার হওয়ার পরও সম্পাদক রিপোর্টটা নিয়ে কোনো কথা বলছেন না বলে জিজ্ঞাসা করলাম এর ভাগ্যটা জানতে। তিনি বললেন, রাষ্ট্রপতি জিয়া রিপোর্টটা ছাপতে মানা করে দিয়েছেন। কষ্ট লাগল। কারণ এক সাক্ষাতে শহীদ জিয়া সাংবাদিকদের তার চোখ-কান হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। ভাগ্যক্রমে রাষ্ট্রপতির সাথে কয়েক সপ্তাহ পর আমার এক পার্টিতে দেখা। আমি সুযোগ নিয়ে বললাম, স্যার, আপনি আমাদের আপনার চোখ-কান বলে বর্ণনা করেছেন; অথচ ঢাকা-আরিচা রাস্তার দুর্নীতির খবর ছাপতে নিষেধ করলেন। তিনি বললেন, হ্যা, আপনাদের সম্পাদক বলেছিলেন এমন একটা রিপোর্টের কথা। তাকে তো ছাপতে বলেছি এবং কথা দিয়েছিলাম অ্যাকশন নেব। কই, আপনারাই তো ছাপলেন না। ছাপুন না। অফিসে ফিরে আমাদের খন্দকারকে বললাম, রিপোর্টের কপি আছে কি না? আর সেই ভদ্রলোকের সাথে যোগাযোগ করা যায় কি না? মুনির এসে বললেন, সেই ভদ্রলোক মারা গেছেন। এর কয়েক বছর পর আমি রোমে গিয়েছিলাম। সেখানের আমাদের অ্যাম্বাসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সাথে অ্যাম্বাসেডরের রুমে দেখা। তিনি বললেন, তার এক আত্মীয় ফাও-য়ে চাকরি করেন, তিনি আমার সাথে দেখা করতে চান। খুশি হলাম এক ফৃ লাঞ্চের দাওয়াতে, তা-ও বিদেশ-বিভুইয়ে। তিনজন মিলে খাচ্ছিলাম। সেই ভদ্রলোক বললেন, আপনাকে কৃতজ্ঞতা জানাতে এ দাওয়াত। আপনারা ঢাকা-আরিচা রোডের বিষয়ে লিখেছিলেন। আমি বললাম, তা তো ছাপা হয়নি। তিনি বললেন, তাতে কি? রাষ্ট্রপতি জিয়া তার ওপরই অ্যাকশন নিয়েছেন। আমার তখন খাবার গলা দিয়ে নিচে যাচ্ছিল না। সংক্ষেপে ঘটনা হলো, সেই তদন্ত রিপোর্টে পচিশজনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আনা হয়। রাষ্ট্রপতি জিয়া সেই ডিপার্টমেন্টকে অর্ডার দেন অনুসন্ধান করতে। তারা সেই ফাইলেরই খোজ পায় না। আমাদের প্রতিবেদনের উল্লেখিত নথি ধরে সম্ভবত আঠারোজন সম্পর্কে কাগজপত্র পাওয়া যায়। তাদের চাকরিচ্যুত করেন জিয়া। আর আলোচিত ভদ্রলোকের নাম থাকলেও নথিতে জোরালো এভিডেন্স না থাকায় তাকে চাকরি ছেড়ে দেওয়ার অথবা বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ থাকলে সেই আবেদন করার জন্য বলা হয়। ভদ্রলোক পরের সুযোগটি গ্রহণ করেন। শহীদ জিয়া এ বিষয়ে একটা মজার মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, আমিও বুরোক্র্যাসির অংশ, তবে তা মিলিটারি বুরোক্র্যাসি। আমি সিভিল বুরোক্র্যাসির সাথে পেরে উঠছি না। মনে হলো তিনি সিভিল বুরোক্র্যাসির প্যাচকে ভয় পেতেন। সিভিল বুরোক্র্যাসি জনগণ ও রাজনীতিবিদদের কেমনভাবে ব্যবহার করে সে কথা জিয়া বুঝতেন, তার নজির পেলাম দিনাজপুরের সার্কিট হাউসে রাষ্ট্রপতির সামনে বসে হেদায়েত হোসেন মোরশেদ ও আমি। জিয়ার সামনে দরখাস্তের ঢিবি। তিনি প্রত্যেকটি দেখছিলেন এবং পাশে রাখছিলেন। একপর্যায়ে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালেন। মোরশেদকে উদ্দেশ করে বললেন, কিছুক্ষণের মধ্যেই এই দরখাস্তকারীরা যারা বাইরে জড়ো হয়েছে স্লোগান তুলবে, আর সাথে সাথে ডিসি এসে জানতে চাইবেন তিনি কি করবেন। জিয়া তার বক্তব্য শেষ করতে না করতেই স্লোগান শুরু হলো, জিন্দাবাদ ইত্যাদি। পরক্ষণেই দু-তিনজন স্থানীয় রাজনীতিবিদকে নিয়ে ডিসি হাজির এবং নানা কথার মাঝে তিনি জানতে চাইলেন রাষ্ট্রপতির হুকুম। স্থানীয় নেতারাও ডিসির প্রশংসা করলেন আর কামনা করলেন রাষ্ট্রপতির আর্শীবাদ ও সহানুভূতি। জিয়া দরখাস্তগুলোর একাংশ ডিসির হাতে তুলে বললেন, এগুলোর ওপর কাজ করুন নিরপেক্ষ এবং মেরিট অনুসারে। অন্যগুলোকে দেখিয়ে বললেন, ওগুলো বাদ দিন। প্রয়োজন হলে ব্ল্যাক লিস্টও করতে পারেন। পরে দেখলাম যেগুলোকে বাদ দিতে বলেছেন তাতে শহীদ জিয়ার কোনো কোনো আত্মীয় প্যাট্রন হিসেবে আছেন। জিয়া চাননি কোনো কাজেই ফেভারিটিজম হোক। জিয়া ভালোবাসতেন বাংলাদেশকে তীব্রভাবে। যে কারণে তার একটি প্রিয় গানের প্রথম কলিই হলো প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ। তিনি তার জীবন দিয়ে তা প্রমাণ করে গেছেন। এমন নেতৃত্ব শতাব্দীতে দু-একটিই আসে।