মুক্তিযুদ্ধচলাকালীন আওয়ামী লীগ নেতারা কলকাতায় যা করতেন - মাজহার
কলকাতার ৫৮ বালিগঞ্জ বাড়িটি ছিল প্রবাসী সরকারের আবাসিক কার্যালয়। ওই ভবনেই বসবাস ও দাপ্তরিক কাজ করতেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ এবং অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি নজরুল ইসলাম। প্রয়োজনের তুলনায় ছোট এ বাড়িটিতে সারাক্ষণ জয় বাংলার লোকের ভিড় লেগেই থাকত। বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসা আওয়ামী লীগদলীয় এমপি, নেতা, আমলা, কর্মী, আত্মীয়স্বজন, অমাত্য, চামচা, সবার জন্য এ বাড়িটি ছিল অবারিত। ঢালাওভাবে ভাত-গোশত দিয়ে ভূরিভোজ, এমনকি নিশি যাপনেও কোনো কার্পণ্য ছিল না। অভ্যাগতদের প্রত্যেকের হাতে দেখা যেত একটা নতুন বৃফকেস কিংবা ছোট এটাচি, কোনো কোনো নেতার কাধে ঝোলানো ব্যাগ। আহার-নিদ্রা, এমনকি প্রাকৃতিক কর্ম সম্পাদনের সময়ও এসব ব্যাগ কাছ ছাড়া করত না কেউ। এমন একটি ঘটনায় সেনা কর্মকর্তারা একজন অতিথির বৃফকেস পরীক্ষা করলে ১২ লাখ পাকিস্তানি রুপি (বর্তমান মূল্য প্রায় ৪৩ কোটি টাকা) উদ্ঘাটিত হয়। ঘটনার আকস্মিকতায় কর্নেল ওসমানীর জেরার মুখে ভদ্রলোকটি টাকার কথা চেপে যান। পরে উদ্ধারকৃত বিপুল পরিমাণ টাকা প্রধানমন্ত্রীর তহবিলে জমা করে দেওয়া হয়। মূলত দেশ ছাড়ার আগে প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতারা পূর্ব বাংলার ব্যাংক ট্রেজারিগুলো সব উজাড় করে অর্থ ও সোনাদানা নিয়েই পাড়ি জমান ভারতবর্ষে। প্রয়াত লেখক আহমদ ছফা এ জাতীয় আরেকটি ঘটনার কথা বর্ণনা করেন এভাবে, এই সোনা তো বাংলাদেশের জনগণের সম্পত্তি। যে তিনজন আমরা সোনা নিয়ে এসেছিলাম তার মধ্যে একজন এমপির আপন ছোট ভাই। আরেকজন স্থানীয় আওয়ামী লীগ প্রেসিডেন্টের শালা। তারা এখন কোথায় আছে, কী করছে, কিছু জানি না। অথচ এদিকে শুনতে পাচ্ছি, সেই সোনা ইতিমধ্যে ভাগভাটোয়ারা হয়ে গেছে। ... সত্যিই তো, এ রকম একজন মানুষ দেড় মণ সোনা বয়ে নিয়ে এসেছে শুনলে এখন কে বিশ্বাস করবে? (অলাতচক্র, পৃষ্ঠা ৬২)। বিভিন্ন শরণার্থী শিবির পরিচালনার দায়িত্বে ইনডিয়া সরকারের লোকের পাশাপাশি আওয়ামী নেতারাও ছিলেন। এসব নেতার বেশির ভাগই পরিবার-পরিজন সমেত বেশ আয়েশি জীবন যাপন করতেন। এমনকি অভিজাত দোকান, শুড়িখানা ও নাইটক্লাবগুলো জয় বাংলার লোকে ছিল জমজমাট। তখন পশ্চিম বাংলায় জয় বাংলার লোক মানেই বাড়তি খাতির। এ নিয়ে ৮ নাম্বার সেক্টর কমান্ডার মেজর জলিল লিখেছেন, আমি যখন তাদেরকে দেখেছি কলকাতার অভিজাত এলাকার হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলোতে জমজমাট আড্ডায় ব্যস্ত। একাত্তরের সেই গভীর বর্ষায়ত দিন-রাতে কলকাতার অভিজাত রেস্টুরেন্টগুলোতে বসে গরম কফির কাপে চুমুক দিতে গিয়ে হাঁটুতক কাদাজলে ডুবন্ত মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং শিবিরগুলোতে অবস্থানরত হাজার হাজার তরুণের বেদনাহত চেহারাগুলো তারা একবারও দেখেছে কিনা তা আজও আমার জানতে ইচ্ছা করে। আমার জানতে ইচ্ছা করে কলকাতার পার্ক স্ট্রিটের অভিজাত নাইট ক্লাবগুলোতে বিয়ার হুইসকি পানরত আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের মনোমুকুরে একবারও ভেসে উঠেছে কিনা সেই গুলিবিদ্ধ কিশোর কাজলের কথা, যে মৃত্যুর পূর্বক্ষণ পর্যন্ত চিৎকার করে ঘোষণা করেছে জয় বাংলা। আমার জানতে ইচ্ছা করে আরো অনেক কিছু। কিন্তু জানতে ইচ্ছা করলেই তো আর জানা যায় না। কলকাতা ও আগরতলার নাইটক্লাব ও বেশ্যালয়ে প্রবাসী নেতাদের অনেকেরই নিয়মিত আসা-যাওয়া ছিল। প্রবাসী সরকারের একজন মন্ত্রী সোনাগাছির বেশ্যালয়ে মারামারি করে কলকাতা পুলিশের হাতে ধরা পড়ে অবশেষে মুজিবনগর সরকারের কাছে হস্তান্তরিত হন। আহমদ ছফা ঘটনাটিকে এভাবে বর্ণনা করেছেন, যে সকল মানুষকে দেশে থাকতে শ্রদ্ধা করতাম, কলকাতায় অনেকের আচরণ দেখে সরল বাংলায় যাকে বলে কিংকর্তব্যবিমূঢ় তাই হতে হচ্ছে। এখনো তোমরা স্যার ডাকছ তার বদলে শালা বললেও অবাক কিছু ছিল না। এখানকার একটা সাপ্তাহিক খবরটা ছেপেছে। প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের একজন মন্ত্রী নাকি সোনাগাছিতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। জানেন তো স্যার, সোনাগাছি কি জন্য বিখ্যাত? পুলিশ অফিসারের জেরার মুখে ভদ্রলোককে কবুল করতেই হলো, তিনি ভারতে প্রবাসী সরকারের একজন মন্ত্রী। পুলিশ অফিসার তখন বললেন, তাহলে স্যারের গুডনেমটা বলতে হয়। মন্ত্রী বাহাদুর নিজের নাম প্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গে ভেরিফাই করে দেখে যে বক্তব্য সঠিক। পুলিশ অফিসারটি দাতে জিভ কেটে বললেন, স্যার, কেন মিছিমিছি সোনাগাছির মতো খারাপ জায়গায় নিজেকে নাহক ঝুটঝামেলার মধ্যে পড়বেন? আর ভারত সরকারের আতিথেয়তার নিন্দা করবেন। আগেভাগে আমাদের স্মরণ করলেই পারতেন, আমরা আপনাকে ভিআইপির উপযুক্ত জায়গায় পাঠিয়ে দিতাম। (অলাতচক্র, আহমদ ছফা, ১৯৯৩, পৃষ্ঠা ২০-২১) এসব নেতার কীর্তিকলাপ নিয়ে যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের তীব্র ঘৃণা উঠে এসেছে আহমদ ছফার কলমে, কলকাতা এলে মাথায় খুন চেপে বসে। ইচ্ছা জাগে এই ফর্সা কাপড় পরা তথাকথিত নেতাদের সবকটাকে গুলি করে হত্যা করি। এয়াসা দিন নেহি রয়েগা। একদিন আমরা দেশে ফিরে যাব। তখন সব কয়টা বানচোতকে গাছের সঙ্গে বেঁধে গুলি করে মারব। দেখি কোন বাপ সেদিন তাদের উদ্ধার করে। কলকাতার নরম বিছানায় ঘুমিয়ে পোলাও-কোর্মা খাওয়ার মজা ভালো করে দেখিয়ে দেব। (ছফা, ৮১) স্টপ জেনোসাইডখ্যাত চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান যুদ্ধকালে পশ্চিম বাংলার বিভিন্ন স্থানে কাজ করতে গিয়ে উদ্বাস্তু শিবিরে আওয়ামী লীগ নেতাদের অপকর্মের অনেক ফুটেজ ও ডকুমেন্ট সংগ্রহ করেন, যা দিয়ে তিনি ডকুমেন্টারি বানাতে চেয়েছিলেন। কিন্তু যুদ্ধ-পরবর্তী সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট পাপিষ্ঠরা এসব কারণে জহির রায়হানকে গায়েব করে দেয়, তার লাশটিও খুজে পাওয়া যায়নি। জহির রায়হান সংবাদ সম্মেলন করে এসব চিত্র প্রকাশের হুমকি দিয়েছিলেন। আর এ হুমকির পরই তার অন্তর্ধানের ঘটনা ঘটে। জহির রায়হানের ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার যুদ্ধকালে ১৪ ডিসেম্বর হানাদার বাহিনীর দ্বারা অপহৃত হন। ১৯৭২-এর ৩০ জানুয়ারি ভাইকে খোজার নাম করে জহির রায়হানকে ডেকে নেয় স্বাধীন বাংলার প্রশাসন পরিচিতরা। এরপর থেকে জহির নিখোজ। তার লাশও খুজে পাওয়া যায়নি। মুজিব সকারের পুলিশ ও মিরপুর এলাকা নিয়ন্ত্রকারী বাহিনী জহির রায়হানের পরিবারকে সাহায্য করার পরিবর্তে এড়িয়ে যেত। জহির রায়হানের নিখোজ হওয়া প্রসঙ্গে ৯ নাম্বার সেক্টর কমান্ডার মেজর এম এ জলিল লিখেছেন, মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের আওয়ামী লীগ নেতাদের কুকীর্তি ফাস করে দিতে চাওয়ায় নিখোঁজ হন সাংবাদিক জহির রায়হান। ভারত অবস্থানকালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের অনেক কিছুই জানতে চেয়েছিলেন স্বনামধন্য সাহিত্যিক এবং চিত্র নির্মাতা জহির রায়হান। তিনি জেনেছিলেন অনেক কিছু, চিত্রায়িতও করেছিলেন অনেক দুর্লভ দৃশ্য। কিন্তু অত সব জানতে বুঝতে গিয়ে তিনি বেজায় অপরাধ করে ফেলেছিলেন। স্বাধীনতার ঊষালগ্নেই তাকে সেই অনেক কিছু জানার অপরাধে প্রাণ দিতে হয়েছে। ভারতের মাটিতে অবস্থানকালে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের চুরি, দুর্নীতি, অবৈধ ব্যবসা, যৌন কেলেংকারী, বিভিন্ন রূপ ভোগ-বিলাসসহ তাদের বিভিন্নমুখী অপকর্মের প্রামাণ্য দলিল ছিল, ছিল সচিত্র দৃশ্য। আওয়ামী লীগের অতি সাধের মুক্তিযুদ্ধের বিরুদ্ধে জহির রায়হানের এত বড় অপরাধকে স্বার্থান্বেষী মহল কোন যুক্তিতে ক্ষমা করতে পারে? তাই বেঁচে থেকে স্বাধীনতার পরবর্তী রূপ দেখে যাওয়ার সুযোগ আর হয়নি জহির রায়হানের। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার ৩ নাম্বার আসামি স্টুয়ার্ড মুজীবেরও ঘটেছিল এই পরিণতি। এই দায়িত্বশীল নিষ্ঠাবান তেজোদীপ্ত যুবক স্টুয়ার্ড মুজীব ৯ নাম্বার সেক্টরের অধীনে এবং পরে ৮ নাম্বার সেক্টরে যুদ্ধ করেছে। তার মতো নির্ভেজাল ত্বরিতকর্মা একজন দেশপ্রেমিক যোদ্ধা সত্যিই বিরল। প্রচ- সহস ও বীরত্বের অধিকারী স্টুয়ার্ড মুজীব ছিল শেখ মুজিবের অত্যন্ত প্রিয় অন্ধভক্ত। মাদারীপুর থানার অন্তর্গত পালং অধিবাসী মুজীবকে দেখেছি বিদ্যুতের মতোই এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত ছোটাছুটি করতে। কী করে মুক্তিযুদ্ধকে ত্বরান্বিত করা যায়, ভারতের কোন নেতার সাথে যোগাযোগ করলে মুক্তিযুদ্ধের রসদ লাভ করা যায়, কেবল সেই চিন্তা এবং কর্মেই অস্থির দেখেছি স্টুয়ার্ড মুজীবকে। মুজীব ভারতে অবস্থিত আওয়ামী লীগ নেতাদের অনেক কুকীর্তি সম্পর্কে ওয়াকিফহাল ছিল। এত বড় স্পর্ধা কি করে সইবে স্বার্থান্বেষী মহল? তাই স্বাধীনতার মাত্র সপ্তাহ খানিকের মধ্যেই ঢাকা নগরীর গুলিস্তান চত্বর থেকে হাইজ্যাক হয়ে যায় স্টুয়ার্ড মুজীব। এভাবে হারিয়ে যায় বাংলার আরেকটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। জহির রায়হানের হারিয়ে যাওয়া নিয়ে তার সহধর্মিণী চিত্রনায়িকা সুচন্দা বলেন, জহির বেচে থাকা অবস্থায় সর্বশেষ প্রেসক্লাবে দাড়িয়ে এক বক্তব্যে বলেছিলেন, যারা এখন বড় বড় কথা বলেন, নিজেদের বড় বড় নেতা মনে করেন, তাদের কীর্তি কাহিনী, কলকাতায় কে কী করেছিলেন, তার ডকুমেন্ট আমার কাছে রয়েছে। তাদের মুখোশ আমি খুলে দেব। এ কথা তিনি মুখ দিয়ে প্রকাশ্যে বলে ফেলার পরই তার ওপর বিপদ নেমে আসে। এই বলাটাই তার জন্য কাল হয়ে দাড়াল। জহির রায়হানের বোন নাসিমা কবির নিখোজ জহির রায়হারের খোজে বড় বড় নেতাদের কাছে রাত-দিন পাগলের মতো ছুটে গেছেন। ১৯৭২ সালে পত্রিকাগুলোতে বেশ লেখালেখি শুরু হলো। রফিকের ফোন পেয়ে জহির রায়হান ঘর থেকে বের হয়ে যান। সেই রফিককে একদিন হঠাৎ করে সপরিবারে আমেরিকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়। জহির রায়হানের বড় বোন নাসিমা কবিরকে ডেকে নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমান সরাসরি বললেন, জহিরকে নিয়ে বেশি চিৎকার করলে তুমিও নিখোঁজ হয়ে যাবে। (দৈনিক আজকের কাগজ, ৮ ডিসেম্বর ১৯৯৩)। অর্থাৎ শেখ মুজিব নিজেও জহির রায়হানের গুমকারীদের সঙ্গে আপস করেছিলেন! কেবল জহির রায়হানই নয়, যুদ্ধকালে প্রবাসী সরকারের বিভিন্ন নেতার দুর্নীতি ও অনৈতিক কর্মকা- নিয়ে শেখ মুজিবের কাছে ট্রাইব্যুনাল গঠন করার বিচার ও তাদের দল থেকে বহিষ্কারের দাবিও তোলে স্বাধীন বাংলা যুব কমান্ড। মুজিবনগর সরকারের ১০০ কোটি রুপি (বর্তমান মূল্য প্রায় ৩৫,৭০০ কোটি টাকা) খরচের কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি (ইত্তেফাক ১৫ আগস্ট ১৯৭২)। প্রবাসী সরকারের কর্তাব্যক্তি এবং নেতাদের দুর্নীতি ও নানা অপরাধমূলক কর্মকা-ের নানা প্রমাণাদি চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে জনতার আদালতে বিচারের সুযোগ এখনো শেষ হয়ে যায়নি। সূত্র : টুডে ব্লগ, ২২ সেপ্টেম্বর ২০১৪